শুধু কাকের ডাক
মাসুদুল হক
১.
মোতিঝিলের পোষা পানিতে সেদিন চাঁদের আলো পড়েছিল কাঁপতে কাঁপতে। চারদিকে উৎসবের উচ্ছ্বাস, মশালের আলো, আতরের গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা তবলার বোল। মুর্শিদাবাদের রাত যেন নিজের বুকের মধ্যে আরেকটি রাতকে লুকিয়ে রেখেছিল।
১৭৪৬ সাল।
নবাব আলিবর্দী খানের দুই নাতি ইকরামউদ্দৌলা ও সিরাজউদ্দৌলার বিয়ে উপলক্ষে মোতিঝিলের প্রাসাদে বসেছিল বিরাট আসর। উত্তর ভারত থেকে এসেছিল নামকরা তাওয়ায়েফদের একটি দল। সেই দলের মধ্যমণি মুন্নি।
নাচ শেষ করে মুন্নি যখন মখমলের পর্দার আড়ালে এসে বসল, তখনও ওর কপালে ঘামের চিকচিক। গলায় মুক্তোর মালা, হাতে কাঁচের চুড়ি, চোখের কোণে গাঢ় কাজল। বাইরে থেকে তাকালে ওকে মনে হবে এমন এক নারী, যার ভাগ্য নিজের হাতেই লেখা।
কিন্তু মুন্নি জানত, ওর ভাগ্য ওর হাতে নেই।
ও শুধু জানত কীভাবে অন্যের চোখে নিজের ভাগ্যকে সুন্দর করে তুলতে হয়।
“আজ তোমার নাচে দিল্লির গন্ধ ছিল,” পাশে বসা এক সঙ্গিনী বলল।
মুন্নি মৃদু হাসল।
“দিল্লির গন্ধ নয়, বোন। মানুষের বাসনার গন্ধ। যেখানে পুরুষ, সেখানেই এই গন্ধ।”
সঙ্গিনী হেসে উঠল। মুন্নি হাসল না।
ওর চোখ তখন পর্দার ফাঁক দিয়ে আসরের দিকে।
পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মীরজাফর আলি খান।
তিনি তখন নবাব নন। ক্ষমতার সিংহাসন তাঁর থেকে বহু দূরে। কিন্তু তাঁর চোখে ছিল এমন এক স্থিরতা, যা মুন্নির অভ্যস্ত চোখ এড়িয়ে গেল না।
রাত গভীর হলে মীরজাফর একা ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“আপনি কি সবসময় এমন করে মানুষের দিকে তাকান?” মুন্নি জিজ্ঞেস করল।
“কীভাবে?”
“যেন মানুষকে দেখছেন না, তার ভেতরটা দেখছেন।”
মীরজাফর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,“তোমাকেও কি সবাই শুধু নাচতে দেখে?”
মুন্নির বুকের কোথাও যেন অদৃশ্য একটি দরজা খুলে গেল।
ও জীবনে অসংখ্য পুরুষের চোখ দেখেছে। কামনা, লোভ, বিস্ময়, অহংকার—সব চিনেছে। কিন্তু এই চোখে ছিল অন্য কিছু। হয়তো আকাঙ্ক্ষা। হয়তো অধিকারবোধ। হয়তো এমন এক ক্ষুধা, যার নাম তখনও ওরা কেউ জানত না।
সেই রাতের পর মুন্নি আর উত্তর ভারতে ফিরে গেল না।
কেন?
ইতিহাস তার উত্তর দেয় না।
মানুষের জীবনে কিছু সিদ্ধান্তেরও কোনো যুক্তি থাকে না। মানুষ কখনও নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেয় না; ভবিষ্যৎই কখনও কখনও মানুষকে বেছে নেয়।
মুন্নি কি মীরজাফরের রূপে মুগ্ধ হয়েছিল? তাঁর বংশমর্যাদায়? তাঁর পুরুষালি ব্যক্তিত্বে? নাকি ও এমন একজন পুরুষের সন্ধান করছিল, যার পাশে দাঁড়ালে নিজের অনিশ্চিত জীবনকে একটি স্থায়ী পরিচয় দেওয়া যায়?
ও জানত না।
শুধু জানত, এক সকালে উত্তর ভারতের কাফেলা চলে গেল, আর মুন্নি থেকে গেল মুর্শিদাবাদে।
তারপর বছরগুলো দ্রুত বদলে গেল।
মীরজাফর নবাব হলেন।নহবতখানায় সকাল-সন্ধ্যা সানাই বাজল। প্রাসাদের বারান্দায় ঝুলল রেশমি পর্দা। মশালের আলোয় রাতগুলো সোনালি হয়ে উঠল। কিন্তু সেই সোনালি আলোয় মুন্নির ভেতরের অন্ধকারও যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে।
নিজামত পরিবারের উচ্চবংশীয় বেগমেরা তাকে প্রথমে তুচ্ছ করেছিল।
“এক তাওয়ায়েফ!”—কারও ঠোঁটে বিদ্রূপ ফুটে উঠেছিল।
মুন্নি শুনতে পায়।কিছু বলে না।শুধু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকায়।
“তাওয়ায়েফ,” ও ফিসফিস করে বলে, “কিন্তু এখন আমি কার?”
আয়না কোনো উত্তর দেয়নি।সেদিনই হয়তো ওর মধ্যে একটি পরিবর্তন ঘটে যায়।
২.
ভালোবাসার মুন্নি ধীরে ধীরে ক্ষমতার মুন্নি হয়ে উঠল।
ও বুঝে গেল, প্রাসাদে টিকে থাকতে হলে সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি দরকার স্মৃতি। কে কাকে অপমান করেছে, কে কার বিরুদ্ধে কথা বলেছে, কে কখন কার দরজায় গিয়েছে—সব মনে রাখতে হয়।
ও মনে রাখতে শুরু করে।অসাধারণভাবে মনে রাখে।
মীরজাফর কখনও কখনও ওকে বলেন, “তুমি খুব বেশি ভাবো।”
মুন্নি মৃদু হেসে বলে, “যে মানুষ একবার নিচে পড়েছে, সে আর ওপরে দাঁড়িয়েও নিচের মাটি ভুলতে পারে না।”
মীরজাফর ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন।তিনি হয়তো বুঝতেন না, এই নারীকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, না কি ওই নারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষারই আরেকটি রূপকে ভালোবেসেছিলেন।
সময় গড়াল। মীরজাফরের পতন এল। নির্বাসন এল। কলকাতার দিন এল।মুন্নি তখনও তাঁর পাশে।ক্ষমতা হারিয়েও ও ক্ষমতার ভাষা ভুলল না।ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ বাড়ল। প্রাসাদের অন্দরমহল থেকে ও ধীরে ধীরে রাজনীতির বাইরের দরজাগুলো খুলে ফেলল। নিজের দুই পুত্রের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য ও যে কোনো দরজায় কড়া নাড়তে পারত।
এক রাতে মীরজাফর ওকে বললেন, “তুমি কি আমার জন্য এত কিছু করছ?”
মুন্নি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“আপনার জন্য?”
ও জানালার বাইরে তাকাল। গঙ্গার কালো পানিতে দূরের আলো কাঁপছিল।
“না। মানুষের নিজের জন্য কেউ কিছু করে না, সাহেব। সবাই নিজের ভেতরের কোনো অভাব পূরণ করতে অন্যকে ব্যবহার করে।”
“তাহলে তোমার অভাব কী?”
মুন্নি এবার তাঁর দিকে তাকাল।
“নিরাপত্তা।”
শব্দটি উচ্চারণ করেই ও যেন নিজেই চমকে উঠল।
ওর জীবনে এত সম্পদ, এত মানুষ, এত প্রভাব—তবু ওর গভীরে ছিল এক ভয়। যে মেয়ে একদিন কোনো কাফেলার সঙ্গে চলে যেতে পারত, আবার কোনো পুরুষের ইচ্ছায় কোথাও আটকে যেতে পারত।
সম্ভবত সেই ভয় থেকেই ওর উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্ম।
যে নারী একদিন নিজের ভাগ্য অন্যের হাতে দেখেছিল, সে পরে অন্যের ভাগ্য নিজের হাতে তুলে নিতে চাইল।
সেই চাওয়াই ওকে ক্ষমতার চূড়ায় নিয়ে গেল।
কিন্তু নিয়তি মানুষের ইচ্ছাকে কখনও পুরোপুরি মানে না।
দুই পুত্রই অকালমৃত্যুর কোলে চলে গেল।
মুন্নির চারপাশে তখনও প্রাসাদ। সোনা। চাকর-বাকর। ক্ষমতার স্মৃতি।কিন্তু সন্তানহীন রাতের নিস্তব্ধতায় এসবের কোনো শব্দ নেই।
৩.
একদিন গভীর রাতে ও মীরজাফরের পুরোনো পোশাকের একটি বাক্স খুলে বসে। কাপড়ে আর তাঁর গন্ধ নেই। শুধু পুরোনো আতরের মৃদু গন্ধ।মুন্নি কাপড়টি মুখে চেপে ধরল।
“তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে এলে, জাফর?”
কেউ উত্তর দিল না।
তারপর ও নিজেই বলল, “আমি তো তোমার সঙ্গে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি চলে গেলে কেন?”
সময়ের কাছে কোনো মানুষের জন্য উত্তর থাকে না।
১৮১৩ সালের জানুয়ারি।
মুন্নি বেগমের জীবনের আলো তখন প্রায় নিভে গেছে।
১৪ জানুয়ারির সন্ধ্যায় কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গপ্রাচীর থেকে ওর স্মরণে নব্বই বার তোপধ্বনি উঠল। পতাকা অর্ধনমিত হলো।
একসময় যে নারী ক্ষমতার শব্দে অভ্যস্ত ছিলেন, ওর মৃত্যুকে সম্মান জানিয়ে আকাশ কেঁপে উঠল।কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা হলো—একই সময়ে কোনো এক অন্ধকার ঘরে হয়তো ওর নাম উচ্চারণ করার মতো আপনজনও ছিল না।
মুর্শিদাবাদের জাফরাগঞ্জে ওকে কবর দেওয়া হলো।
বহু বছর পরে এক বিকেলে সেই সমাধিস্থলের ওপর নেমে এল ধূসর আলো।
শীতের মরা ঘাসে ধীর বাতাস ঘষে যাচ্ছিল। পুরোনো গাছের পাতাগুলো শুকনো শব্দে কাঁপছিল। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছিল সন্ধ্যার কুয়াশায়।
মুন্নি বেগমের সমাধির প্রাচীরে একটি কাক এসে বসল।
কর্কশ স্বরে ডাকল।তারপর আরেকটি।নহবতখানার সুর নেই। মশালের আলো নেই। সশস্ত্র প্রহরী নেই। রেশমি পর্দা নেই।শুধু কাকের ডাক।
৪.
২০২২ সাল।
সমাধির ওপর সন্ধ্যার শেষ আলো এসে পড়েছিল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা। অথচ এই নীরবতার ভেতরেই যেন বহু শতাব্দীর কোলাহল চাপা পড়ে আছে—নবাবের দরবার, হারেমের ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার টানাপোড়েন, ইংরেজ সাহেবদের আনাগোনা, আর সেইসব মানুষের পদশব্দ, যাদের একসময় মনে হয়েছিল, পৃথিবীটা বুঝি তাদেরই।
মুন্নি বেগমের সমাধির দিকে তাকিয়ে আমার হঠাৎ মনে হলো, ইতিহাসের বিশাল প্রাসাদগুলো আসলে বালির তৈরি। মানুষ যতই উঁচুতে উঠুক, সময়ের অদৃশ্য স্রোত একদিন তাকে ধীরে ধীরে নামিয়ে নিয়ে যায়। কেউ সেই স্রোত থামাতে পারে না।
মুন্নি বেগম সেই স্রোতকে থামাতে চেয়েছিলেন। জীবনভর লড়েছেন। নিজের ভাগ্য নিজেই লিখতে চেয়েছেন। যে জায়গায় অন্যেরা হয়তো নীরবে মাথা নত করত, সেখানে তিনি নিজের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছেছেন, মানুষের ভাগ্য বদলেছেন, নিজের সন্তানদের জন্য মসনদের অধিকার আদায় করেছেন। তাঁর জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, এই নারী হার মানার জন্য জন্মাননি।
অথচ শেষ পর্যন্ত তিনিও হেরে গেলেন।
হয়তো এটাই মানুষের নিয়তি। আমরা ভাবি, আমরাই আমাদের জীবনকে চালাই; নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের ইচ্ছা আর নিজের বুদ্ধি দিয়ে পথ তৈরি করি। অথচ পেছনে ফিরে তাকালে কখনও কখনও মনে হয়, অদৃশ্য কোনো হাত অনেক আগেই আমাদের পথের বাঁকগুলো এঁকে রেখেছিল। আমরা শুধু সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে একদিন এসে দাঁড়াই এমন এক দরজার সামনে, যার ওপারে আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকে না।
সেদিন জাফরাগঞ্জে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই আমার ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে এসেছিল। এত বড় একটি জীবনের শেষ ঠিকানা—একটি নির্জন সমাধি। চারপাশে ইতিহাসের এত স্মৃতি, অথচ তাঁকে মনে রাখার মতো মানুষ যেন ক্রমেই কমে এসেছে।
আমি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
মুন্নি বেগমের কবরের ওপর বসে থাকা কাকটি আবার ডাকল।কর্কশ সেই ডাক নীরব সন্ধ্যাকে যেন আরও গভীর করে দিল। তারপর কাকটি ডানা মেলে উড়ে গেল মুর্শিদাবাদের ধূসর আকাশের দিকে। আমি তাকিয়ে দেখলাম, অন্ধকার ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, কোথা থেকে যেন মনে হলো, বহু পুরোনো কোনো স্মৃতির মতো মুর্শিদাবাদের বাতাসে ভেসে এল নহবতের ক্ষীণ সুর।
📖 আইডিয়া প্রকাশনবই • ইবুক • সম্মানি — মুক্তচিন্তার অসীম সীমানা
https://www.ideaabd.com/blog/shudhu-kaker-dak-3
তারিখ: 18 Sep, 2026
গল্প
আইডিয়া সাহিত্যপত্র•১০ মিনিট পাঠ•১,৫০৪ শব্দ
শুধু কাকের ডাক
08 Sep, 2026 • 12:00 AM৩৩ পঠিত

কভার চিত্র: শুধু কাকের ডাকআইডিয়া সাহিত্য সাময়িকী
শুধু কাকের ডাক
মাসুদুল হক
১.
মোতিঝিলের পোষা পানিতে সেদিন চাঁদের আলো পড়েছিল কাঁপতে কাঁপতে। চারদিকে উৎসবের উচ্ছ্বাস, মশালের আলো, আতরের গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা তবলার বোল। মুর্শিদাবাদের রাত যেন নি...
❦
লেখকের জন্য পাঠক সম্মানি
লেখাটি পড়ে ভালো লাগলে আপনার সামান্য অনুপ্রেরণা ও সম্মানি লেখকের সৃষ্টিশীল পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বিকাশ নম্বর: 01833775779• সম্মানির ৭০% লেখক পাবেন, ৩০% সাইট মেইনটেনেন্স










পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য