বয়স কত হবে? চার মাস হবে। চারদিকে আনন্দ। খুশি সবাই। ঘর আলোকিত হবে। আর কদিন পর দেখব পৃথিবীর মুখ।
একটা লোক সকালে নিয়মিত হাঁটে- বেশ কবছর ধরে একই জায়গায়। তাকে সেখানে গাড়ি চাপায় মরতে হলো। যে মারা গেল সে ছিল আমার বাবা। মায়ের মুখে শুনেছি। রাজপ্রাসাদে জন্মাবার আয়োজন ছিল। একটা মৃত্যু- যে মৃত্যু কারো জন্ম ঠেকাতে পারে না সেই মৃত্যু সব আনন্দ আয়োজন তছনছ করে দিলো।
জন্মাবার আগেই মাথায় অনেক দেনা! আমাকে পেটে নিয়ে মা একটার পর একটা সম্পত্তি বেচে দিয়ে ধার দেনা আর দাবি মেটাচ্ছিল। যত ফ্যাক্টরি ছিল কমাসে লোকসানে পড়ল। চালু রাখলে ঋণ করতে হবে। কাক মরলেও তো চেনা অচেনা কাক সমবেদনা জানায়। একটা মানুষ হঠাৎ মরল তার যেন কোনো আত্মীয়ই নেই! ব্যাংকে মাত্র দশ লাখ টাকা। অথচ বাবা মারা যাওয়ার সময় ছিল কয়েক কোটির মতো! তদন্ত করার প্রয়োজন নেই। সহজ সরল মা কেন যেন সব ছেড়ে দিয়েছে। আমি নাকি তার সব!
শোক মানুষকে ফতুর করে দেয়- এটা আমার আবিষ্কার। আমার জন্মের এক বছর পর মায়ের এক বন্ধুর সাথে মায়ের দেখা। মায়ের মন বদলে গেল। হাসি খুশি ভাব। লোকটা খুব ভাল মানুষ। সন্তান আছে তারপরও সব জেনে শুনে মাকে দিলো বিয়ের প্রস্তাব। অবাক বিষয়- মা রাজি নয়। কিন্তু তার একান্ত আপন কাউকে দরকার। লোকটা মাকে সময় দিলো। মায়ের বয়স ছাব্বিশ। লোকটার বয়সও তেমনি হবে। লোকটা অবিবাহিত। মায়ের যত ধন সম্পত্তি আছে তার চেয়ে অনেক গুণ ধনী লোকটা। পাত্রী নাকি পাচ্ছে না। মাকে তার পছন্দ। ভদ্র এবং সম্ভ্রান্ত লোকটা বিনয়ের সাথে সবার সঙ্গে কথা বলে। মা- তার সাথে কথা বলে নিঃসঙ্কোচে। ছমাস পর মায়ের মন গলে গেল। বিয়ের দিন ঠিক। বিয়ে হলো। বাসর লোকটার বাড়িতে। লোকটা একা বিশাল বাড়িতে থাকে। পাশের একটা ঘরে আমাকে রেখে মা গেল তার বাসর ঘরে। এই প্রথম আমি একা থাকছি। বাসর ঘরে লোকটা ওয়াশ রুমে যখন ঢুকল মা হঠাৎ লোকটাকে না জানিয়ে চুপি চুপি আমার ঘরে এল। আমাকে কোলে নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে অ্যামেরিকায় চলে এল। সেই থেকে আমি অ্যামেরিকায়।
মা বিষন্ন হলেও কারো প্রতি আর অনুরক্ত হয়নি। অ্যামেরিকায় শুরু হল নতুন জীবন। হাতে অর্থ কড়ি নেই। মা একটা দোকানে সেলস গার্লের কাজ নিল। আমি যে তার সন্তান তা জানতে দেয়নি। আমাকে ভাগনে বলে পরিচয় দেয় দোকান মালিকের কাছে। বাচ্চা আছে জানলে কাজ দিবে না। প্রথম দিকে ছোট্ট একটা ঘরে মা আমাকে বন্দি করে রেখে যেত। তারপর হাতে টাকাপয়সা হলে বাঙালি কমিউনিটির ডে-কেয়ারে আমাকে রাখা শুরু করল। ফলে দোকানের মালিক বুঝতেই পারলো না আমি তার সন্তান। সেই দোকানদার বড়োই ভালো মানুষ ছিল। বাংলা বুঝত না। মাঝে মাঝে মা ওই দোকানে আমাকে নিয়ে যেত। দোকান মালিক আমাকে স্নেহ করত। মা বাংলায় আমাকে আদর করত- বাবা-বাবা বলে ডাকত। দোকান মালিক হাসত। মাকে মাঝে মাঝে বলত- তুমি তো ভাগ্নেকে মায়ের মতোই আদর কর। মাও নাকি বলত- মায়ের চেয়ে মাসিমার দরদ বেশি। দোকান মালিক হাসত।
আমার বয়স যখন দশ- তখন আমার একটা বড়ো রকমের রোগ জেঁকে বসে। চিকিৎসার জন্য এত টাকা লাগবে তা ভেবে মা দিশেহারা। এর আগে দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল। মায়ের যা রোজগার তাতে স্বচ্ছলভাবে আমরা চলতে পারতাম। আমি বিছানায় শুয়ে আছি মা মাথায় হাত বুলাচ্ছে। মায়ের চোখের পানি আমার কপালে পড়ল। আমি মায়ের নাক টানার শব্দ শুনে উঠে বসলাম। মায়ের মুখের দিকে তাকাতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। এরপর মা আমার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করল হাসিমুখে তার একটা কিডনি বেচে।
এর কিছুদিন পরে মা ট্যাক্সির ড্রাইভার হিসেবে কাজ শুরু করল। ধীরে ধীরে আমিও বড়ো হতে থাকি। আমার আঠারোতম জন্মদিন উপলক্ষে মা একটা নিজস্ব ট্যাক্সি কিনে ফেলল। এটা মায়ের কেনা প্রথম ট্যাক্সি। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই জন্মদিনের ট্যাক্সি উপহার পাই। মাকে নিয়ে আমি লং ড্রাইভে বেরুই। মাকে এই দিন সব চেয়ে উজ্জ্বল মনে হলো। মা বলল- ‘আজ থেকে তুই মেচুউর। নিজে রোজগার করবি.....।’ আমি হেসে সায় দিই। জন্মদিনে কোনো জাঁকজমক পার্টি হয়নি। মা আর আমি। রাতে খেতে খেতে মায়ের জীবনের সব কথা মা আমাকে খুলে বলে। মা আমার কাছে মাফ চাইল। বলল- ‘তোকে ছেড়ে কোথাও যেতে চাইনি। বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম, বিয়ে করেছি কিন্তু তুই একটু দূরে থাকায় বাসর ছেড়ে পালিয়েছি। জানতাম আমার বিয়ে তোকে দূরে নিয়ে যাবে কিন্তু ওই সময় ভুলে গিয়েছিলাম। তুই মাফ করে দিস।’ আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধু দুচোখে পানি গড়িয়ে পড়েছে।
...........................................................










পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য