অন্যরা যখন বৃন্দাবনে তখন আমি রাজপথে।পড়ি কারমাইকেল কলেজ, রংপুরে। নানান রকম এক্সপেরিমেন্ট চালাই। সময় সুযোগ পেলে কলেজ লাইব্রেরীতে যাই। আর মেসে থাকলে তো টিভির রুমের শিরোমণি আমি। হাজার রকম আইডিয়ার উৎগীরণে প্রেম উঁকি দিতে সাহস পায়নি ফাস্ট ইয়ারে। তবে মনে মনে নিজেকে প্রেমিকই ভাবতাম।
আমি না হয় কাউকে ভালোবাসিনি তাই বলে কি মেয়েরাও কেউ বাসে নাই আমাকে? ওটা জরিপ করা হয়নি। মেয়েরা প্রেমে পড়বে এমন যোগ্যতাও আমার নেই। কারণ প্রেমের ফুয়েল তো টাকা-যা বরাবরই আমার সাধনার বাইরে।
ছেলেমেয়েরা প্রেম-ট্রেম চুটিয়ে করছে। ফাস্ট ইয়ার গেলো সেকেণ্ড ইয়ার গেলো। থার্ড ইয়ারে এসে প্রেম একটু উঁকি দিতে লাগল। তবে কার সাথে প্রেম করব? মেয়ে তো নাই। সবাই বুকড! পোড়াকপাল! আশে-পাশে সুন্দর সুন্দর মেয়ের উড়াউড়ি। লেকিন এরা কেউ আমার নয়, হতেও পারে না। কারণ এদের স্বপ্ন পুরুষ সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্মি অফিসার। আমার মতো আলা ভোলার খাওয়া নাই। ফোর্থ ইয়ারের ফাইনাল দেবো দেবো এমন আগে মানে টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলো আর কি। আসলে সময়টা সঠিক মনে নেই। কাইজেলিয়া রোডে হাঁটছি- একটা মেয়ে! আরে ভাই বুকের মধ্যে বিশাল একটা ক্ষত তৈরি করল। ভাইরে হাজার হাজার মেয়ে আছে, দেখেছি- এমন মেয়ে তো আগে দেখি নাই! মেয়েদের ফলো করার অভিজ্ঞতা ছিলো না বলে তাকে ফলো করার চিন্তা মাথায় এলো না। বুঝলাম না কোথায় থাকে, কিসে পড়ে, বাড়ি কই, নাম কি। শুধু তর্জমা করলাম -সে একটা মেয়ে। এই মেয়ে যে ক্ষত তৈরি করল-তা মেসে আসার পরও পূরণ হয়নি। রাতে ছটফটাতে ছটফটাতে সময় পার করেছি। ভাইরে, আমি কি প্রেমে পড়েছি? বুঝলাম না।
কাইজেলিয়া রোড ধরে ক্যাম্পাসে ঢুকছি। ভাইরে দেখি-ওই মেয়েটা! কই যেনো যাচ্ছে। সাথে তার একটা মেয়ে। মানে রুম মেট হতে পারে অথবা বান্ধবি টাইপের কেউ। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি- ওই মূহুর্তে বাতাসটা আসল। আহা! তার চুল উড়ল! আমি হ্যাবলার মতো দেখছি, মেয়েটা বুঝতে পেরে একটা মুচকি হাসি দিলো। কিছুদিন পর বুঝলাম ওই মেয়েটা কমার্সের কোনো সাবজেক্টে পড়ে। কারণ দূর থেকে তাকে কমার্স বিল্ডিং-এ দেখতে পেয়েছি।
এরপর থেকে ক্রমাগত আমি উতলা হতে থাকি। মনে মনে আসমান-জমিনে খোদাই করতে থাকি- সে আমার! অনামিকা মেয়েটার জন্য এত সুন্দর আকুলতা আগে কখনো উদিত হয়নি আমার জনমেও। তার দেখা পেয়েছি কদাচিৎ। এই কাইজেলিয়া রোড, লালবাগ, খেলার মাঠে, থার্ড বিল্ডিং আর শহিদ মিনারে।
হঠাৎ একদিন দেখি আমার খুব কাছের বন্ধু তাকে চেনে। সে তাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করল। বুঝলাম মেয়েটা আমার ইয়ার মেট। তাতে কি? মেয়েটা তো অসাম!
একদা এক সময়- কারমাইকেল কলেজিয়েট প্রাইমারি স্কুলের মাঠে বাচ্চাদের কুজকাওয়াজ প্রাকটিস দেখছি। মনে হলো, ওদের প্রাকটিস ভিডিও করি। ভিডিও করা শুরু করলাম। হায় রে হায়- ওই সময় সেই মেয়েটা কালো একটা ব্যাগ হাতে হোস্টেলের দিকে যাচ্ছে। ভাগ্য ভালো মেয়েটার ছবি এমনি এমনিই আমার ভিডিওতে চলে আসে। মেয়েটা আমার পাগলামি দেখে হাসি দিয়েছে। তারপর বুঝলাম সে কোন হোস্টেলে থাকে। মেসে এসে বারবার সেই ভিডিওটায় মেয়েটাকে দেখি। ওমা- কি সুন্দর!
দিনকে দিন মরিয়া হয়ে যাচ্ছি। ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল চলে এলো। মেয়েটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। মেয়েটাকে মাথায় নিয়ে ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষা দিলাম। আগে কখনো মেয়েটাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে আসিনি। তবে এবার এলাম। কলেজিয়েট স্কুলের মাঠে ঘোরাঘুরি করলাম-কারন পাশেই মেয়েটার হোস্টেল। ভাগ্য কাকে বলে- মেয়েটাকে দেখতে পেলাম।
একসময় বুঝতে পারলাম- আমি পুরুষ! চাইলেই সব পাওয়া যায় না। এই সভ্যতায় পুরুষের অলংকার টাকা! লেকিন আমার তা নেই। আর মেয়েটা অনার্স শেষ করল। মানে অচিরেই তার বিয়ে হবে! মনটা এসব ঐতিহাসিক যুক্তি মানতে চাইছে না, বাস্তবে বিদ্রোহ করেও লাভ নেই। কি করি যে!
তবুও বিপ্লবী হওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল। সে আমার- হ্যাঁ, তাকে তো অন্তত আমার মনের কথাটা জানাতে পারি। এটা তো দরকার। এক বন্ধুকে বললাম। বন্ধুটা বলল,এখন চাকরির চিন্তা কর। ওসব বাদ দে।
আমার এক ইয়ারমেট ওই মেয়েটার হোস্টেলে থাকে। কখনো তার সাথে কথা হয়নি। তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। মনটা আর বেশি সায় দিলো না।
আন্দোলন চলছে মাথায় ও মনে। আসলেই তো আমি পুরুষ! এটা ভুললে অন্ধকারে হারিয়ে যাবো। লেকিন ওই মেয়েকে যে তীব্র ভালোলাগে! তারপরেও আমার পুরুষত্ব মেয়েটা ভোলার জন্য জাগরণ তৈরি করতে থাকে। উৎসাহ দেয়। ফাস্ট ইয়ার, সেকেণ্ড ইয়ারের মেয়েরা বুকড, এই মেয়ে কি খালি? সেও হয়তো কোনো টাকা ওয়ালার সাথে চুক্তি সেড়েছে।
একদিন দেখলাম, মেয়েটা বিসিএস-এর বই নিয়ে হাঁটছে। মানে মনে হলো, সিরিয়াস সাধনা করছে। আবার মনে হলো, আরে না বিসিএস-এর বই নিয়ে ঘোরা তো আজকালকার স্টাইল।
অনেক কষ্টে মেয়েটাকে ভুলতে চেষ্টা করছি। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম- আরে কতো মেয়ে আছে! এটা সুন্দর, সেই রকম-ঠিক আছে। তাই বলে এর জন্য তো আমার জীবন থেমে থাকতে পারে না। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ। লেকিন ওই যে পাথরে আঁকা ছবি মুছে গেলেও হৃদয়ে আঁকা ছবি মুছে না। মোছার চেষ্টা চলছে। এমন একদিন দেখি, মেয়েটা একটা ছেলের সাথে রিক্সায় ঘুরছে! কি হাসি! মনে মনে সান্ত্বনা দিলাম নিজেকে-ছেলেটা তো মেয়েটার ভাইও হতে পারে! না। কাজ হচ্ছে না। তাকে তো আমি বাতিল করেছি- তারপরও কেন আসে তার প্রসঙ্গ? কার সাথে ঘুরবে, শুবে তাতে আমার কি? আবার ভাবি, যাক , গেছে ভালো হয়েছে।
মোটামুটি মেয়েটাকে ভুলে গেছি। মানে দুই হাজার তেরো সালের দিকে। ছাব্বিশে মার্চ সারা দেশে একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে। ক্যাম্পাসে এলাম। শহিদ মিনারের সামনে আয়োজন। একদম পেছনের দিকে দাড়ালাম। ভিডিও করবো জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার দৃশ্য। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শুরু হলো- আমি পেছন থেকে মোবাইলে ভিডিও শুরু করেছি-জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শেষ না হতেই দেখি ওই মেয়েটা হাসি হাসি ভাব নিয়ে ক্যামেরার সামন দিয়ে যাচ্ছে। হ্যাবি পুলকিত হলাম। আবার কষ্টও পেলাম। রাতে রুমে এসে যখন ভিডিওটা দেখতে লাগলাম বারবার মেয়েটা চোখের সামনে ভাসে। আর বুকের মধ্যে ক্যামন ক্যামন করে।
জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার ঐতিহাসিক ভিডিওটা যখনই দেখি তখন ওই মেয়েটা চলে আসে। মেয়েটার কথা ভাবতে এবং ছবি আঁকতে কোথা থেকে যেনো ইশারা আসে- বুঝি না। মেয়েটাকে ভুলতে বাধ্য হয়ে ভিডিওটা ডিলিট করে দিয়েছি কিন্তু সে আবছা হলেও আজও সুযোগ পেলে খানিকটা উঁকি দেয়!










পাঠক মন্তব্য ও পর্যালোচনা০টি
আপনার মূল্যবান মতামত বা রিভিউ দিন
অতিথি হিসেবে মন্তব্য