বই: তিন টাকায় একটা কবিতা
লেখক: মুরাদ জোয়ার্দার
প্রকাশক: আইডিয়া প্রকাশন, রংপুর, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ: বেনামিবাউল
মূল্য: ১৫০/-
আগে আমি আমার কথা বলি। আমি কুমারখালীর একজন হাটুরে পাবলিক। সেই হিসেবে অনেক নবপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ চট করে আমার হাতে এসে যায়। ভালো লাগলেই রাতারাতি অনুবাদ করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। কখনও সে সাহস হয় না। কারণ আমি হাঁড়ি গড়ানো কুমার, কোলার বায়না নিতে ভয় পাই।
কী যেন বলছিলাম, কবি মুরাদ জোয়ার্দারের কবিতার বই “ তিন টাকায় একটা কবিতা” আমার হাতে এসেছে এবং পড়েছি এবং ভালো লেগেছে…. ইত্যাদি।
হিসেব করে দেখলাম ৫০টি কবিতার মূল্য ১৫০ টাকা, কাজেই প্রতিটি কবিতার দাম তিন টাকা। এপ্রঙ্গে শুধু এটুকুই বলি এই অনামিকা কবিতাগুলোর সংকলনের নামটিও অনামিক; বুঝলাম কবি কোনও নাম বা অভিধাকে ‘ট্যাগিং’ বিবেচনা করেন; বটে- এটা একটি পরিচিত আধুনিকতা। যাক গে।
এবারে আসল কথায় আসি অথবা কবিতা বিষয়ে কোনও আসল কথা থাকতে পারে না। কবিতাই কবির আসল কথা। কবিরা সব কিছুর আত্মার দিকে (মানে থিং ইন ইটসেলফের দিকে ) তাকিয়ে যে ছন্দময় অনুভূতির ছবি আকেন বা আঁকিবুঁকি কাটেন সেটাই না কবিতা?
এই অর্থে মুরাদ জোয়ার্দার নিকষ আধুনিক কবি; কাজেই তাঁর কবিতার নিম্নরূপ অকাট্য এবং আখেরী বয়ান থাকতেই পারে; দেখুনঃ
“যদিও আপনি পুনর্বার উত্থিত হবেন।
পুনর্বার আপনি বিচারিক আদালতে।
পুনর্বার তারপর আপনার আবার
অন্ধকার অথবা আলোর দিকে যাত্রা।
পুনর্বার এবং
সেটাও একাকী।”
যদিও আমার ভালোলাগা কবিরা আত্মার দিকে তাকিয়ে সত্য বলেন, মুরাদ জোয়ার্দারও, তবু ছন্দ বা অলংকারকে তাঁরা অনেক গুরুত্ব দেন। ছন্দ থাকে অন্তরে আর কবিতা থাকে যন্তরে বা ডিভাইসে। ওপরের লাইনগুলোতে ‘পুনর্বার’ শব্দের পুনরাবৃত্তি লক্ষ করেছেন? ওটা কিন্তু অলঙ্কার। জেনে বা না জেনে কবিরা এসব লাগিয়ে দেন। কী ওই অলংকারের নাম? এর অনেক নাম। এক অভিধা দিয়ে নানা নামের এই অলংকারকে নির্দেশ করা যায়,- সেটা হলো [Alliteration]- এলিটারেশন কাকে বলে? একই অর্থে বা আলাদা অর্থে একই ধ্বনি, শব্দ, প্রসঙ্গের পুনরাবৃতিকে এলিটারেশন বলে। এটা অনুপ্রাসের মতো।
আর দেখুন পাখিদের দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন এক সোচ্চার সর্বপ্রাণবাদীঃ
“ যেন পৃথিবীর সব প্রেম শুকিয়ে গেলে
আমি সেখানে মুখ লুকাই।
যেন কোনও এক জনমে আমিও
তাহাদের মতো পাখীই ছিলাম।”
রাষ্ট্রচোর ‘বেনজির’-দের কঠোর সমালোচক কবি কিন্তু একটি শুদ্ধ, বাঙ্গাল, আধ্যাত্মিক, সমতা ও সমন্বয়ের প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাস করেন? পড়েননি? তাহলে পড়ে দেখুন, আইডিয়া প্রকাশনের এই সুদর্শন বই।
স্বপন রায়
সাবেক অধ্যক্ষ, মেহেরপুর সরকারি কলেজ